স্টাফ রিপোর্টার অতুল বসাক
বাংলাদেশ থেকে মাদকদ্রব্যের বিস্তার সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা সম্ভব কি না—এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে প্রথমেই মাদকের সরবরাহব্যবস্থা, চোরাচালান এবং এর সঙ্গে জড়িত সংগঠিত চক্রের দিকে নজর দিতে হবে। শুধু মাদকসেবীকে গ্রেপ্তার করে কিংবা ছোটখাটো বিক্রেতাদের আইনের আওতায় এনে একটি দেশের মাদক সমস্যা স্থায়ীভাবে সমাধান করা কঠিন। মাদকের মূল উৎস, সরবরাহকারী এবং সিন্ডিকেটের নেতৃত্বদানকারীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি।
দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদক ছড়িয়ে পড়ার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। সীমান্তপথে চোরাচালান, অবৈধ সরবরাহব্যবস্থা, স্থানীয় পর্যায়ে বিক্রয় এবং মাদককে ঘিরে গড়ে ওঠা অপরাধী নেটওয়ার্ক—সবকিছু মিলিয়ে সমস্যাটি জটিল হয়ে উঠেছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানও হতে হবে তথ্যভিত্তিক ও সমন্বিত। কেবল রাস্তার পর্যায়ে মাদক বিক্রেতাদের গ্রেপ্তার নয়, অর্থের লেনদেন, চোরাচালানের পথ, মজুতের স্থান এবং পুরো সরবরাহ নেটওয়ার্ক তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাদের গোয়েন্দা তৎপরতা বাড়িয়ে মাদক সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ পায়, তাহলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে মাদকবিরোধী অভিযানে যেন নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার না হন, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি।
মাদক নির্মূলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতাও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো কর্মকর্তা বা সদস্য যদি মাদক ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা করেন, তথ্য গোপন করেন কিংবা অবৈধ সুবিধা গ্রহণের মাধ্যমে মাদক ব্যবসাকে টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেন, তাহলে অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রমাণিত অপরাধের ক্ষেত্রে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কারণ একটি শক্তিশালী মাদকবিরোধী অভিযান তখনই কার্যকর হবে, যখন আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের পক্ষপাত বা দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না।
তবে শুধু আইন প্রয়োগ করলেই মাদক সমস্যা পুরোপুরি সমাধান হবে না। মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও সামাজিকভাবে পুনঃস্থাপনের সুযোগ বাড়াতে হবে। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, চিকিৎসক, সমাজকর্মী এবং সাধারণ জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং মাদক গ্রহণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে বাস্তবভিত্তিক শিক্ষা দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ।
সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশে মাদকের বিস্তার মোকাবিলায় মূল চ্যালেঞ্জ হলো এর সরবরাহব্যবস্থা ও সংগঠিত চক্রকে কার্যকরভাবে শনাক্ত করা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যদি তথ্যভিত্তিক তদন্ত, আন্তঃসংস্থার সমন্বয়, জবাবদিহিতা এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে পারে, পাশাপাশি চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়, তাহলে মাদক সমস্যার ব্যাপকতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। মাদকমুক্ত সমাজ গড়তে তাই শুধু গ্রেপ্তার নয়—মূল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা, দুর্নীতি প্রতিরোধ এবং সামাজিক পুনর্বাসন—সবগুলো উদ্যোগ একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন।