
রাণীশংকৈল-পীরগঞ্জে পুলিশের পৃথক অভিযান, নগদ ১ লাখ ৩ হাজার ৮০০ টাকা উদ্ধার
রাণীশংকৈল প্রতিনিধি:
ঠাকুরগাঁওয়ের রাণীশংকৈল ও পীরগঞ্জ উপজেলায় মাদকবিরোধী পৃথক অভিযানে বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট ও নগদ টাকা উদ্ধার করেছে পুলিশ। অভিযানে রাণীশংকৈল থেকে ৩০ পিস ট্যাপেন্টাডলসহ এক যুবককে আটক করার পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পীরগঞ্জে অভিযান চালিয়ে আরও ১ হাজার ২৪৫ পিস ট্যাপেন্টাডল উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় আরও একজনকে আটক করা হয়। পুলিশের অভিযানের সময় অপর একজন পালিয়ে যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের এজাহার সূত্রে জানা যায়, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে রাণীশংকৈল থানার জিডি নং-২৬৪ অনুযায়ী থানার অফিসার ইনচার্জের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, গ্রেফতারি পরোয়ানা তামিল ও মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় টহল দিচ্ছিল।
এরই ধারাবাহিকতায় রাত আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটের দিকে রাণীশংকৈল থানাধীন ৪ নম্বর লেহেম্বা ইউনিয়নের গোগর ঝাড়বাড়ী এলাকার গোগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান গেটের সামনে পাকা রাস্তার ওপর পুলিশ সদস্যরা পৌঁছালে এক ব্যক্তিকে পুলিশের টহল গাড়ির উপস্থিতি দেখে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করতে দেখা যায়।
পরে পুলিশ সদস্যরা ধাওয়া করে তাকে ঘটনাস্থলেই আটক করেন। আটক ব্যক্তির নাম মো. মাসুদ রানা (২৯)। তিনি রঘুনাথপুর এলাকার মৃত জামাল উদ্দিনের ছেলে।
পুলিশ জানায়, আটকের পর উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে তার দেহ তল্লাশি করা হয়। তল্লাশির একপর্যায়ে তার লুঙ্গির ডান কোচ থেকে স্বচ্ছ পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় তিনটি পাতায় মোট ৩০ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করা ট্যাবলেটের প্যাকেটের গায়ে ইংরেজিতে ‘Tapentadol Tablet 100 mg’ লেখা ছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার করা ৩০ পিস ট্যাবলেটের আনুমানিক বাজারমূল্য ৬ হাজার টাকা। একই সময় তার কাছ থেকে মাদক বিক্রির অর্থ হিসেবে ৬ হাজার ৬০০ টাকা নগদ উদ্ধার করা হয়। পরে রাত আনুমানিক ৮টা ৫৫ মিনিটে জব্দ তালিকা প্রস্তুত করে উদ্ধারকৃত মাদক ও টাকা জব্দ করা হয়।
মাসুদের দেওয়া তথ্যে পীরগঞ্জে অভিযান
পুলিশের এজাহারে বলা হয়েছে, আটক মাসুদ রানাকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি পুলিশকে তার নাম-ঠিকানা প্রকাশ করেন। পরে উদ্ধার হওয়া ট্যাপেন্টাডল কোথা থেকে সংগ্রহ করেছেন—এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে তিনি দাবি করেন, পীরগঞ্জ থানাধীন পৌর এলাকার মিত্রবাটি (জোরাকবর) গ্রামের রেললাইনের পূর্ব পাশে বসবাসকারী প্রদীপ দাসের কাছ থেকে ওই ট্যাবলেটগুলো কিনেছেন।
তিনি আরও জানান, ট্যাপেন্টাডলগুলো বিক্রির উদ্দেশ্যে নিয়ে রাণীশংকৈলের দিকে ফেরার সময় পুলিশ তাকে আটক করে।
এই তথ্য পাওয়ার পর বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়। একই সঙ্গে পীরগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জকে মুঠোফোনে বিষয়টি জানানো হয়। পরে দুই থানার পুলিশের সমন্বয়ে অভিযান পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
রাত আনুমানিক ৯টা ৩০ মিনিটে পুলিশের একটি দল পীরগঞ্জ থানাধীন পৌর এলাকার মিত্রবাটি (জোরাকবর) গ্রামের উদ্দেশ্যে রওনা হয়। রাত আনুমানিক ১০টার দিকে পুলিশ প্রদীপ দাসের বাড়ির কাছে পৌঁছালে সেখানে থাকা দুই ব্যক্তি পালানোর চেষ্টা করেন।
এ সময় পুলিশ **শ্রী প্রদীপ দাস (২০)**কে আটক করতে সক্ষম হলেও তার সহযোগী শ্রী শ্যামল দাস (২২) কৌশলে পালিয়ে যায় বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
তোশকের নিচে মিলল বিপুল পরিমাণ ট্যাপেন্টাডল
পুলিশের দাবি, প্রদীপ দাসকে আটক করার পর তার বসতবাড়িতে তল্লাশি চালানো হয়। উপস্থিত সাক্ষী ও পুলিশের সদস্যদের সামনে পর্যাপ্ত বৈদ্যুতিক আলো এবং টর্চলাইটের আলোতে তার শয়নকক্ষ তল্লাশি করা হয়।
তল্লাশির সময় শয়নকক্ষের খাটের তোশকের নিচে একটি ব্যবহৃত প্লাস্টিকের বাজারের ব্যাগ পাওয়া যায়। ওই ব্যাগের ভেতরে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় বিপুল পরিমাণ ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট রাখা ছিল বলে পুলিশ জানায়।
গণনা করে পুলিশ মোট ১ হাজার ২৪৫ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট উদ্ধার করে। উদ্ধার করা ট্যাবলেটের প্যাকেটের গায়েও ‘Tapentadol Tablet 100 mg’সহ বিভিন্ন ইংরেজি লেখা ছিল বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া ১ হাজার ২৪৫ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেটের আনুমানিক মূল্য ২ লাখ ৪৯ হাজার টাকা। একই অভিযানে নগদ ৯৭ হাজার ২০০ টাকা উদ্ধার করা হয়, যা মাদক বিক্রির অর্থ বলে পুলিশ দাবি করেছে।
সবমিলিয়ে দুই অভিযানে ১ হাজার ২৭৫ পিস ট্যাপেন্টাডল ট্যাবলেট এবং নগদ ১ লাখ ৩ হাজার ৮০০ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে বলে এজাহারের তথ্য থেকে জানা যায়।
পূর্বের একাধিক মাদক মামলার তথ্য
পুলিশের এজাহারে আটক ও পলাতক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পূর্বের একাধিক মাদক মামলায় জড়িত থাকার তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
এজাহারে বলা হয়েছে, প্রদীপ দাসের বিরুদ্ধে পীরগঞ্জ থানায় ২০২৫ সালের একটি মাদক মামলা রয়েছে। অন্যদিকে পলাতক শ্যামল দাসের বিরুদ্ধেও ২০২৫ সালের একটি মাদক মামলা থাকার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া জিজ্ঞাসাবাদে মাসুদ রানার দেওয়া তথ্য এবং পুলিশি যাচাইয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পীরগঞ্জ থানায় বিভিন্ন সময়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একাধিক মামলা থাকার তথ্য পাওয়া গেছে বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে।
পলাতক আসামিকে ধরতে অভিযান
পুলিশ জানায়, অভিযানের সময় শ্যামল দাস পালিয়ে যাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে আটক মাসুদ রানা ও প্রদীপ দাসের বিরুদ্ধে উদ্ধার হওয়া মাদকদ্রব্যের ঘটনায় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
এ ঘটনায় রাণীশংকৈল থানার পুলিশের পক্ষ থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা দায়েরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
পুলিশের ভাষ্য, মাদকের বিস্তার ঠেকাতে রাণীশংকৈল ও পীরগঞ্জসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে এই অভিযান চালানো হয়েছে। মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলেও পুলিশ জানিয়েছে।
Leave a Reply